তৌহিদ হোসেন সরকার
কুমিল্লা নগরীর টমছম ব্রিজ এলাকা যানজটমুক্ত রাখতে ২০১১ সালে দক্ষিণ কুমিল্লা ও ঢাকা–চট্টগ্রামগামী যানবাহনের জন্য নগরীর জাঙ্গালিয়ায় নির্মাণ করা হয় আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল। নগর প্রবেশমুখে শৃঙ্খলা ফেরানোই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এক যুগের বেশি সময় পার হলেও সেই লক্ষ্য পূরণ তো দূরের কথা, চরম অব্যবস্থাপনা ও নজরদারির অভাবে এই টার্মিনালই এখন নগরীর যানজটের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, অধিকাংশ আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশ না করেই কচুয়া, জাঙ্গালিয়া ও নোয়াগাঁও চৌমুহনী পর্যন্ত নোয়াখালী–কুমিল্লা মূল সড়কের পাশে অবৈধভাবে পার্কিং করছে। এতে সড়কের কার্যকর প্রস্থ কমে গিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ যানজট।
ফিরতি বাসগুলোর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। টমছম ব্রিজ সংলগ্ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে ইউটার্ন করে সড়কের মাঝখানেই বাস ঘোরানো হচ্ছে। দীর্ঘ সময় পার্কিং ও যাত্রী ওঠানামার কারণে পুরো এলাকা প্রায়ই অচল হয়ে পড়ে।
সড়ক বন্ধ করে বাস ঘোরানো, যত্রতত্র পার্কিং এবং অনিয়ন্ত্রিত যাত্রী ওঠানামার কারণে টমছম ব্রিজ ও আশপাশের সড়কে ভয়াবহ যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, দিনের পর দিন এসব অনিয়ম চললেও ট্রাফিক পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
আন্তঃজেলা বাস টার্মিনালের ভেতরে গিয়েও মিলেছে বিশৃঙ্খলার চিত্র। প্ল্যাটফর্ম আছে নেই যথাযত ব্যাবহার , স্পষ্ট নিয়মকানুন বা তদারকি ব্যবস্থা। যে যার সুবিধামতো বাস রাখছে। যাত্রীদের অভিযোগ, টার্মিনালের কোনো কার্যকর কর্তৃপক্ষ বা অভিভাবক নেই বললেই চলে। ফলে টার্মিনালটি তার মূল কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি পরিবহনের ৬০০ থেকে ৭০০টি বাস ও মিনিবাস এই টার্মিনালের আওতায় চলাচলের কথা। এর মধ্যে রয়েছে উপকূল, যমুনা, মদিনা, রয়েল, এশিয়া এয়ারকন, এশিয়া ট্রান্সপোর্ট, প্রিন্স, কুমিল্লা সুপার, দোয়েল, বলাকা, সোহাগ, শাহআলী সুপার, নাঙ্গলকোট সুপার ও লাকসাম সুপারসহ একাধিক পরিবহন।
তবে উপকূল, রয়েল কোচ, এশিয়া এয়ারকন, এশিয়া ট্রান্সপোর্ট, মিয়ামি, ও প্রিন্স পরিবহন টার্মিনালের বাইরে নিজস্ব অবৈধ বাসস্ট্যান্ড গড়ে তুলে সড়কের পাশেই যাত্রী পরিবহন করছে। এতে ফুটপাত দখল হচ্ছে, সড়ক সংকুচিত হয়ে যানজট আরও তীব্র হচ্ছে।
জেলা শ্রমিক ইউনিয়নের কয়েকজন নেতা জানান, টার্মিনালটি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন করা গেলে সমস্যার সমাধান সম্ভব। তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, সম্প্রসারণের আগে বিদ্যমান অবকাঠামোর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করাই সবচেয়ে জরুরি।
সাধারণ যাত্রীরা অভিযোগ করে বলেন, ব্যক্তিগত ট্রান্সপোর্টগুলো সড়ক দখল করে রাখলেও দেখার কেউ নেই। অবৈধ স্ট্যান্ডগুলো দ্রুত টার্মিনালের আওতায় আনা হলে যানজট অনেকাংশে কমে আসবে।
অনুসন্ধানে স্পষ্ট হয়েছে, টমছম ব্রিজ এলাকার যানজট কোনো স্বাভাবিক সমস্যা নয়। এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা, দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার ফল। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথে এমন বিশৃঙ্খলা কুমিল্লার সামগ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এই যানজট নগরবাসীর নিত্যদিনের দুর্ভোগ হিসেবেই থেকে যাবে—এমন আশঙ্কাই এখন সবার।

