সমতট ডেস্ক: গাজায় নতুন হামলা ও মানবিক ত্রাণ প্রবেশে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে ইসরায়েল এখনও গণহত্যা চালিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। বৃহস্পতিবার সংস্থাটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের আচরণে কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেই। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
অ্যামনেস্টি বলেছে, সাত সপ্তাহের মধ্যে ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ৫০০ বারের বেশি লঙ্ঘন করেছে। এতে অন্তত ৩৪৭ ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৮৮৯ জন আহত হয়েছেন। গণহত্যামূলক এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই বছরে নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা প্রায় ৭০ হাজার।
গাজায় দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে ইসরায়েলের বিমান হামলা চলতে থাকে বৃহস্পতিবারও। এর মধ্যে এমন এলাকাও রয়েছে যেগুলো ‘ইয়েলো লাইন’-এর ওপারে।
অ্যামনেস্টির মহাসচিব অ্যাগনেস কালামার্ড বলেন, ইসরায়েল তাদের অপরাধের প্রাণঘাতী প্রভাব কমাতে কোনও গুরুত্বপূ্র্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছে এমন প্রমাণ নেই। বরং তারা সহায়তা ও জরুরি সেবা প্রবেশ সীমিত করছে এবং গাজার ফিলিস্তিনিদের শারীরিকভাবে ধ্বংস করার মতো শর্ত আরোপ করছে… বিশ্বের উচিত প্রতারিত না হওয়া। ইসরায়েলের গণহত্যা শেষ হয়নি।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে মধ্য গাজার বুরেইজ শিবির ও পূর্ব খান ইউনুসের ভবনগুলোতে হামলা হয়। গাজার সিভিল ডিফেন্স বলছে, এগুলো যুদ্ধবিরতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
একই সময়ে পশ্চিম তীরের ক্যালকিলিয়া, তুবাস, হেব্রন, তুলকারেম ও নাবলুসে অভিযানে নামায় ইসরায়েলি সেনা। তুবাসে অভিযানের সময় অন্তত ২৫ জনকে মারধর করা হয় এবং তাদের চিকিৎসা নিতে হয়েছে বলে স্থানীয় রেড ক্রিসেন্ট কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা ওয়াফা।
বুধবার যুদ্ধবিরতির প্রথম ধাপের অগ্রগতি হিসেবে ইসরায়েল ১৫ ফিলিস্তিনি বন্দির মরদেহ গাজা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করে। এর আগের দিন হামাস ও ইসলামিক জিহাদ আরও এক ইসরায়েলি বন্দির মরদেহ ফেরত দেয়। চুক্তি অনুযায়ী ২৮ জনের মধ্যে ২৬ জনের মরদেহ ইতোমধ্যে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, এ হস্তান্তর দেখিয়ে দিচ্ছে যে, গুরুতর সংকট সত্ত্বেও বিনিময় প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতে তাদের প্রতিশ্রুতি অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে ইসরায়েল প্রায় ২ হাজার ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছে এবং ৩৪৫ জনের মরদেহ ফেরত দিয়েছে। অনেক মরদেহে নির্যাতন, বিকৃতি ও হত্যার চিহ্ন দেখা গেছে।
যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে দক্ষিণ গাজায় ‘ইয়েলো লাইনের’ ইসরায়েল-অধিকৃত অংশে আটকে পড়া ডজনখানেক হামাস যোদ্ধা। গত সপ্তাহে এর মধ্যে ২০ জনকে হত্যা করার দাবি করেছে ইসরায়েল। বুধবার হামাস মধ্যস্থতাকারীদের আহ্বান জানায়, যোদ্ধাদের নিরাপদে ফিরে আসতে ইসরায়েলের ওপর চাপ তৈরি করতে।
যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে সশস্ত্র আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন, গাজাকে অস্থায়ীভাবে পরিচালনার জন্য একটি আন্তর্জাতিক কাঠামো গঠন এবং পুনর্গঠনের রূপরেখা তৈরির আলোচনা চলছে। তুরস্ক, কাতার ও মিসরের মধ্যস্থতাকারীরা মঙ্গলবার কায়রোয় বৈঠক করেন।
তবে এই পরিকল্পনার প্রায় প্রতিটি অংশ নিয়েই অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রতিশ্রুতি নিয়ে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশন্সের গবেষক মোহাম্মদ শেহাদা আল জাজিরাকে বলেছেন, ইসরায়েল এখনও গাজায় জাতিগত নির্মূলের পরিকল্পনা বাদ দেয়নি। গাজাকে হয় ভেঙেচুরে বসবাস অযোগ্য রেখে দেওয়া হবে, নয়তো কোনও প্রতিক্রিয়া দেখালে সেটিকে অজুহাত বানিয়ে ইসরায়েল গণহত্যা পুনরায় শুরু করবে।
অ্যামনেস্টির কালামার্ড আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, যুদ্ধবিরতি যেন চলমান গণহত্যা আড়াল করার ধোঁয়াশা না হয়। তিনি বলেন, মানবিক সহায়তা প্রবেশ নিশ্চিত করা, অবরোধ তুলে নেওয়া এবং চলমান গণহত্যা বন্ধে বিশ্বকে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে।

