তৌহিদ হোসেন সরকার
কুমিল্লা প্রতিনিধি
ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন—প্রায় এক শতাব্দীর জীবন শেষে চলে গেলেন কুমিল্লার প্রাচীন ইতিহাস ও সমাজ জীবনের এক নীরব সাক্ষী এবং “একজন ইতিহাসের যাত্রী”
হাজী মোহাম্মদ ফজলুল করিম। শনিবার (৩০ আগস্ট) দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। এর আগে গত ২২ আগস্ট তিনি কুমিল্লার মুন হাসপাতালে ছয়দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯৯ বছর।
তার স্থায়ী বাসভবন ছিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া ডিগ্রী কলেজ দক্ষিণ সংলগ্ন রাব্বি ম্যানশনে।
১৯২৬ সালে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ জমাদার বাড়ির সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মুন্সি ফজলে আলীর জ্যেষ্ঠ সন্তান ছিলেন । ১৯৪৪ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করে আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ভারতসহ উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে যোগ দেন আয়কর দপ্তরে। দীর্ঘ কর্মজীবনের পর ১৯৮৬ সালে কুমিল্লা আয়কর অফিস থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তার জীবনের পথচলায় তিনি ছিলেন বহু ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী। দেশভাগ (১৯৪৭-৪৮), দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থিরতা, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৬ সালের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, ১৯৬৫ সালের দাঙ্গা ( হিন্দু মুসলিম রায়ট), ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পরিবর্তনসহ একাধিক অধ্যায়ের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। ইতিহাসের এই ধারাগুলো তিনি নিজের জীবনগাঁথায় ধারণ করেছিলেন।
তিনি ছিলেন কলকাতা থেকে চট্টগ্রামগামী বিখ্যাত ট্রেন ভ্রমণের অন্যতম যাত্রী,
হাজী মোহাম্মদ ফজলুল করিম রেখে গেছেন তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। সন্তানরা বর্তমানে দেশ-বিদেশে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।
তার নাতি মেজর ডাঃ আশরাফুল ইমান ভুইয়া (রানা) বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত।
তার এক ছেলে ফজলে খোদা টিটু পরিবারসহ বর্তমানে পর্তুগালে অবস্থান করছেন।
ছোট ছেলে ফজলে মাহমুদ মিঠু—কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক বহিঃক্রীড়া সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক নেতা এবং বর্তমানে সিটি ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার।
এছাড়াও তার ২৬ জন নাতি-নাতনি রয়েছে, যারা পারিবারিক ঐতিহ্যকে বহন করছে।
জানাজা ও দাফন
শনিবার বিকেল ৫টা ৩০ মিনিটে দৌলতপুর স্থানীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় মরহুমের প্রথম জানাজা। এতে অংশ নেন কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমীর কাজী দ্বীন মোহাম্মদ, মহানগরীর কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সবুজসহ জামায়াত, বিএনপি এবং বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ।
বক্তারা মরহুমের সততা, নিষ্ঠা ও প্রজ্ঞার কথা উল্লেখ করে বলেন—তিনি ছিলেন সমাজের আলোকবর্তিকা। প্রবীণ এ ব্যক্তিত্বের মৃত্যু সমাজ হারালো এক ইতিহাসের সাক্ষী।
পরে মরহুমকে নিজ এলাকা দেবিদ্বার ফতেহাবাদ জমাদার বাড়িতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
হাজী মোহাম্মদ ফজলুল করিমের মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে কুমিল্লায়। শতবর্ষের এই ব্যক্তিত্ব সমাজে রেখে গেছেন নানামুখী অবদান, যা আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
আল্লাহ তাআলা মরহুমকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য ধারণের শক্তি দিন—এমন দোয়া করেন জানাজায় উপস্থিত নেতৃবৃন্দ ও এলাকাবাসী।
কালের সাক্ষী হয়ে তিনি স্থান করে নেবেন হাজারো মানুষের হৃদয়ে।

