সমতট ডেস্ক : বাংলাদেশ সরকার টাইফয়েড জ্বরের টিকা দেবে আগামী ১২ অক্টোবর থেকে। বাচ্চার বাবা-মা চেম্বারে এসে জিজ্ঞেস করেন, স্যার টিকা দেব কি না? আমি বলি অবশ্যই দেবেন। টাইফয়েড জ্বর হলো টাইফয়েড নামক ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের সমস্ত লক্ষণ। এটি মারাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
টাইফয়েড এক ধরনের জ্বর, যা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। দুই ধরনের ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে টাইফয়েড হতে পারে। যেমন : সালমোনেলো টাইফি এবং সালমোনেলো প্যারাটাইফি। দুই ধরনের জীবাণুর সংক্রমণের লক্ষণ প্রায় একই ধরনের। সালমোনেলা টাইফি নামক ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করলে যে জ্বর হয়, তাকেই টাইফয়েড জ্বর বলা হয়। আর সালমোনেলা প্যারাটাইফি জীবাণুর কারণে জ্বর হলে তাকে প্যারা টাইফয়েড জ্বর বলে।
টাইফয়েড কীভাবে ছড়ায়
টাইফয়েডের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে মূলত দূষিত খাবার ও পানির মাধ্যমে। যদি কোনো খাবার ও পানির মধ্যে টাইফয়েডের জীবাণু থাকে, তাহলে সেই খাবার খেলে এবং পানি পান করলে খাওয়ার মধ্য দিয়ে টাইফয়েডের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করে ব্যক্তিকে সংক্রমিত করতে পারে। টাইফয়েড আক্রান্ত রোগীর পায়খানা এবং প্রস্রাবের মাধ্যমেও টাইফয়েডের জীবাণু শরীর থেকে বের হয়। কোনো কারণে পানি, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা অথবা ওয়াটার স্যানেটারি সিস্টেমে ত্রুটির কারণে যদি টাইফয়েডের জীবাণু সেখানে মিশে যায়, তাহলে টাইফয়েড ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত রোগী পায়খানা ও প্রস্রাবের পর ভালো করে হাত পরিষ্কার না করলে জীবাণু থেকে যেতে পারে। তার হাতের স্পর্শ বা খাবারের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তিরাও সংক্রমিত হতে পারেন।
টাইফয়েডের লক্ষণ
১. টাইফয়েড জ্বরের একটা নির্দিষ্ট ধরন আছে। জ্বর যখন প্রথম আসে এরপর ছেড়ে যায় না, ক্রমেই আস্তে আস্তে জ্বরের তীব্রতা বাড়তে থাকে। যত দিন যায় জ্বরের মাত্রা বাড়তে থাকে। ১০০ ডিগ্রি থেকে জ্বর ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশিও হতে পারে।
২. পেটব্যথা হয়।
৩. মাথাব্যথা হয়।
৪. ডায়রিয়া হয়। আবার কারো কোষ্ঠকাঠিন্য হতে পারে।
৫. দুর্বল ও ক্লান্তি লাগে।
টাইফয়েড জ্বর থেকে শারীরিক আরো কিছু জটিলতাও হতে পারে। যেমনÑমস্তিস্কে প্রদাহ, নিউমোনিয়া, হেপাটাইটিস, লিভারের সমস্যা দেখা দিতে পারে। টাইফয়েড জ্বর শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রতঙ্গকে আক্রান্ত করতে পারে। টাইফয়েডের চিকিৎসা যদি ঠিকমতো না করা হয়, এটি রোগীর জন্য হুমকি। এমনকি জীবননাশের কারণও হতে পারে। সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া, যা এটি ঘটায়। ভাইরাসটি দূষিত খাবার এবং পানি দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে। এটি এমন এলাকায় বেশি দেখা যায়, যেখানে হাত ধোয়ার অভ্যাস করা হয় না। এটি বাহকদের দ্বারাও ছড়াতে পারে, যারা জানেন না যে তারা জীবাণু বহন করছে।
কেন টাইফয়েড ভ্যাকসিন দেবেন
বাংলাদেশে টাইফয়েড একটি এন্ডেমিক রোগ—অর্থাৎ সারা বছরই রোগটি দেখা যায়। বিশেষ করে বর্ষা ও গরমকালে। এটি পানিবাহিত রোগ, দূষিত খাবার ও পানি দিয়ে ছড়ায়। টাইফয়েড দেরিতে ধরা পড়লে আন্ত্রিক ছিদ্র (intestinal perforation), রক্তক্ষরণ, সেপসিস, মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। ভ্যাকসিন এ ধরনের জটিলতা ঘটার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমায়। বর্তমানে বহু টাইফয়েড জীবাণু একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি প্রতিরোধী (MDR, XDR Typhi)। ভ্যাকসিন দিয়ে প্রতিরোধ করলে এই রেজিস্ট্যান্ট ইনফেকশনের ঝুঁকি কমে। শিশুদের জন্য এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ২–১৫ বছরের শিশুরা বেশি আক্রান্ত হয়। এ বয়সে রোগ হলে পড়াশোনা, বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হয়। প্রতিরোধে সর্বোত্তম চিকিৎসাসেবা নিতে হয়। দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা (তিন-পাঁচ বছর পর্যন্ত কিছু ভ্যাকসিনে)। এগুলো নিরাপদ, কার্যকর এবং তুলনামূলক সস্তা।
দেশে ব্যবহৃত টাইফয়েড ভ্যাকসিনের ধরন
Vi capsular polysaccharide (ViCPS) vaccine দুই বছর বয়সের বেশি শিশুরা নিতে পারে। তিন বছরের জন্য সুরক্ষা, এরপর বুস্টার প্রয়োজন হয়। Typhoid Conjugate Vaccine (TCV)Ñবর্তমানে WHO বেশি সুপারিশ করছে। ছয় মাস বয়স থেকে দেওয়া যায়। দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা (পাঁচ বছর বা তার বেশি)। Expanded Programme on Immunization (EPI)-তে ধীরে ধীরে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে।
কারা নেবে
• ছয় মাসের বেশি বয়সি শিশুরা (বিশেষত উচ্চঝুঁকির এলাকায়)।
• টাইফয়েড এন্ডেমিক এলাকায় বসবাসকারী সবাই।
• স্বাস্থ্যকর্মী, খাদ্য প্রক্রিয়াকাজে যুক্ত ব্যক্তি, ভ্রমণকারী (টাইফয়েড এন্ডেমিক এলাকায়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, পালমনোলজি বিভাগ
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট

