সমতট ডেস্ক: – ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর, জনগণের প্রত্যাশা ছিল যে অন্তর্বর্তী সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড এবং সীমাহীন দুর্নীতিতে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। তবে ‘আমার দেশ’-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক ভিন্ন চিত্র। গুম, খুন ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত অনেক আওয়ামী লীগ নেতা কারাগারের ভেতরেই বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যেখানে প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করছে।
সূত্র জানিয়েছে, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের সহযোগী সংগঠনের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা কারা অভ্যন্তরেই ‘রাজকীয় জীবনযাপন’ করছেন। কারা কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বন্দীদের জন্য অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে। এর বিনিময়ে কারাগারে কোটি কোটি টাকার লেনদেন চলছে বলে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে। অনেক আওয়ামী লীগ নেতা জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর দ্রুত ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে বিদেশে পাড়ি দিচ্ছেন।
প্রকাশ্যে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতাদের দাপট, পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
অন্যদিকে, কারাগারের বাইরে থাকা প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতারা প্রকাশ্যেই অবাধে চলাফেরা করছেন। এমনকি অল্প কয়েকদিন কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে তারা নিজেদের প্রভাব-প্রতিপত্তি জাহির করে ছাত্র-জনতার উদ্দেশে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সমর্থিত কিছু ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ পত্রিকা ও কথিত সাংবাদিক রাষ্ট্রবিরোধী অপপ্রচার এবং উত্তেজনাকর কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সমন্বয়কারী ও নেতৃত্বদানকারীদের প্রকাশ্যে হত্যার মাধ্যমে ‘প্রতিবিপ্লবের’ ডাক দিচ্ছেন।
একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, গত এক মাসে ময়মনসিংহে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ও হামলায় অভিযুক্ত প্রায় ২৫০ জন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তি পেয়েছেন, যা রহস্যজনক। এসব গুরুতর মামলায় তাদের পুনরায় গ্রেপ্তার দেখানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা করা হয়নি। মুক্তির পরপরই এসব নেতা প্রকাশ্যে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকার, রাষ্ট্র ও গণঅভ্যুত্থানের নেতাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক প্রচার চালাচ্ছেন। জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় যারা সরাসরি হামলা ও ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তাদের অনেকের নামেই এখনো কোনো মামলা হয়নি।
আওয়ামী লীগ নেতাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সংবাদ প্রকাশ ও সমালোচনা করায় সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের প্রকাশ্যে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হত্যা ও হামলার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সমালোচকদের ‘জঙ্গি’ তকমা লাগিয়েও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এসব অভিযোগ স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনকে জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না; উল্টো পুলিশ অভিযোগকারীদের সহায়তার পরিবর্তে অভিযুক্ত আওয়ামী নেতাকর্মীদের গোপনে সতর্ক করে দিচ্ছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার রাষ্ট্রবিরোধী পোস্ট মুছে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের নির্ভরযোগ্য তথ্যমতে, আওয়ামী সরকারের আমলে ময়মনসিংহ রেঞ্জে কর্মরত বেশিরভাগ কর্মকর্তাই এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল আছেন, যে কারণে তারা আওয়ামী নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে অনীহা দেখাচ্ছেন। এমনকি পুলিশের গোপন তথ্য ও অভিযানসংক্রান্ত গোয়েন্দা বার্তাও অভিযুক্তদের কাছে আগেই ফাঁস করে দিচ্ছেন।
কারা কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের সিন্ডিকেট: অভিযোগের মূলে
একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যমতে, গত এক মাসে ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে প্রায় ২৫০ জন আওয়ামী নেতাকর্মী ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন, যাদের প্রত্যেকেই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। তারা বর্তমানে তৃণমূল থেকে শুরু করে থানা, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগ গোছানোর কাজ করছেন। পুলিশের বিশেষ ব্রাঞ্চের (এসবি) এক কর্মকর্তা জানান, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে ৭৫০ জনের বেশি আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বন্দী ছিলেন, যা বর্তমানে অনেক কমে এসেছে।
ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার কাজী আখতার উল আলম এ বিষয়ে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো আছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রকাশ্যে ঘোরার অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের জেল সুপার আমিনুল ইসলাম এবং জেলার আতিকুর রহমানের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে, জেল সুপার সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম, শরীফ আহমদ ও এমপি মোহিত উর রহমান শান্তর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী নেতাকর্মী ও কারা সদস্যদের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটে কারা হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. প্রবীর কুমার, ডা. মিথুন কুমার, ডা. রায়হান, ডিপ্লোমা নার্স আবুল বাশার ও আসাদুজ্জামান জড়িত বলে জানা গেছে। তারা টাকার বিনিময়ে আওয়ামী নেতাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বিশেষ সাক্ষাতের ব্যবস্থা এবং অসুস্থতার অজুহাতে মেডিকেলে ভর্তির চুক্তি করছেন।
অনেক রাজনৈতিক নেতা কোনো শারীরিক অসুস্থতা না থাকা সত্ত্বেও কারা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় প্রভাবশালী বন্দী হিসেবে বিশেষ সুবিধা ভোগ করছেন। ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম মিন্টু ও জেলা যুবলীগের সদস্য সৈয়দ সাদিকুল মোমেন তানিম সম্প্রতি কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। মিন্টু ইতোমধ্যে দেশত্যাগ করেছেন, আর সাইফুল ইসলাম ওরফে পেট্রোল সাইফুল ও আসিফ হোসেন ডন জামিনে মুক্তি পেয়ে আত্মগোপনে চলে গেছেন।
কারাগারে রাজনৈতিক সভা ও হত্যার হুমকি
বর্তমানে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রায় ২০ জন আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতা বন্দী রয়েছেন। এদের মধ্যে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক তানজীর আহমেদ রাজীব, মহানগর ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নওশেল আহমেদ অনি, সাবেক কাউন্সিলর মাহবুবুর রহমান দুলাল এবং ওমর ফারুক সাবাস অন্যতম। সূত্র জানায়, তারা কারাগারের ভেতরেই রাজনৈতিক মিটিং, আড্ডা ও বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন। এমনকি সাধারণ হাজতি ও কয়েদিদের হুমকি দিয়ে হাত-পা ম্যাসাজ করিয়ে নিচ্ছেন। কারারক্ষীরা প্রতিবাদ করলে তারা ‘তোমাদের জেল সুপার আমাদের বন্ধু, বেশি কথা বললে বদলি করে রাঙামাটি পাঠিয়ে দেব’ বলে হুমকি দেন।
এছাড়াও, ডেপুটি জেলার সিরাজুস সালেহীন, ইমতিয়াজ জাকারিয়া, আব্দুল কাদির, রিজার্ভ প্রহরী জুলহাস এবং কারারক্ষী আসিফুলের বিরুদ্ধে কারাগারের জানালা দিয়ে আওয়ামী নেতাদের বিশেষ সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে প্রতিবার পাঁচ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। জামিনে মুক্ত আসামিকে শ্যোন অ্যারেস্টের ভয় দেখিয়েও অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটছে। আওয়ামী লীগ নেতাদের নিরাপদে কারাগার থেকে বের করে দেওয়ার জন্য ৫০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে এবং গোপনে বের করে দেওয়ার ঘটনাও অহরহ ঘটছে।
সমন্বয়কদের হত্যার হুমকি ও প্রতিবিপ্লবের ডাক
জুলাই বিপ্লবে ময়মনসিংহে নেতৃত্বদানকারী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শীর্ষ সমন্বয়কারীদের ওপর চলমান হুমকি, হামলা ও হয়রানিমূলক প্রচার রাষ্ট্রীয় নিষ্ক্রিয়তায় একটি বিপজ্জনক চিত্র তুলে ধরেছে। অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলনের সফলতার পর অনেক সমন্বয়কই হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন।
গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর রাতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ জেলার অন্যতম সমন্বয়ক আশিকুর রহমানকে গলা কেটে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় এবং এ বিষয়ে জিডি করা হলেও তদন্তে অগ্রগতি নেই। গত ২০ জানুয়ারি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার আরেক সমন্বয়ক মোহাইমিনুল ইসলাম ওরফে শিহাবের বাড়ির দেয়ালে লেখা হয়, ‘সমন্বয়ক মরার জন্য প্রস্তুত হ’। এই ধরনের সরাসরি হত্যার হুমকি সত্ত্বেও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। গত ২৬ মে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সদস্য সচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াশকে দিনের বেলায় ছুরিকাঘাত করা হলেও পুলিশ এখনো কোনো ‘ক্লু খুঁজে পায়নি’।
এছাড়াও, গত ২৩ মে কথিত আওয়ামী সাংবাদিক বদরুল আমীন ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে বলেন, ‘সমন্বয়কদের ঝুলিয়ে হত্যা করো, এটাই প্রতিবিপ্লব,’ যা সরাসরি রাষ্ট্রদ্রোহ ও সহিংসতার উসকানি। বিষয়টি পুলিশকে জানানো হলেও বদরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়নি; বরং তিনি থানা ও ফাঁড়িতে পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে আড্ডা দেন।
পুলিশের ওপর প্রভাব বিস্তার ও বিশেষ কর্মকর্তাদের নীরবতা
বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্টের পর ময়মনসিংহে পুলিশের এক উপমহাপরিদর্শককে (ডিআইজি) জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও সাবেক মেয়র ইকরামুল হক টিটুর ভাই ব্যবসায়ী আমিনুল হক শামীম পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে লোক মারফত দুই কোটি টাকার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ডিআইজি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলে ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর ‘সমন্বয়ক’ নামধারী ছাত্রলীগ নেতা এবং কিছু কথিত সাংবাদিক ডিআইজির কার্যালয়ে গিয়ে তাকে ঘিরে হুমকি-ধমক ও পদত্যাগের দাবিতে চাপ প্রয়োগ করেন। এই ঘটনায় প্রশাসনিকভাবে এখনো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপদে বড় ধরনের রদবদল হলেও জেলা পুলিশের বেশিরভাগ কর্মকর্তা এখনো ময়মনসিংহ রেঞ্জেই কর্মরত, যারা ছাত্র-জনতার ওপর হামলা ও গুলিবর্ষণে জড়িত ছিলেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব কর্মকর্তা সরাসরি জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি আমিনুল হক শামীমের ব্যবসায়িক স্বার্থরক্ষায় জড়িত। শামীমের মালিকানাধীন ‘শামীম এন্টারপ্রাইজ’ ও তার ছেলে সামিউল হক সাফার বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে এসব কর্মকর্তা কাজ করছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম মোহাইমেনুর রশিদ, যিনি ‘সহিংসতা প্রতিরোধের কৃতিত্বে’ পিপিএম পদক পেয়েছেন, তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে যে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আমিনুল হক শামীমের সুপারিশে ময়মনসিংহে যোগ দিয়েছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পর তাকে অন্যত্র বদলি করা হলেও অজ্ঞাত কারণে দুবার বদলি ঠেকিয়ে তিনি ময়মনসিংহে ফিরে এসেছেন।
মোহাইমেনুর রশিদ এ বিষয়ে বলেছেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের আমল থেকেই এখানে কর্মরত। আমার ব্যাপারে যেসব অভিযোগ রয়েছে সেগুলোর ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জেনে নিন।’

