তৌহিদ হোসেন সরকার
রাজধানীর হাতিরঝিল থানার মগবাজার ওয়্যারলেস মোড় এলাকায় একটি বাসা থেকে দুই শিশুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহত শিশুরা হলো—১০ বছর বয়সী আফরিদা চৌধুরী ও তার দেড় বছর বয়সী ছোট ভাই ইলহাম চৌধুরী। প্রাথমিকভাবে পুলিশের ধারণা, খাবারে বিষক্রিয়ার কারণেই তাদের মৃত্যু হতে পারে। তবে এটি সাধারণ ফুড পয়জনিং, নাকি পরিকল্পিতভাবে বিষ প্রয়োগ—তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
পুলিশ জানায়, শনিবার (২১ ডিসেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে ওয়্যারলেস মোড় এলাকার ৯১ নম্বর এসএইচএস টাওয়ারের নিচে গ্যারেজে রাখা একটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্স থেকে শিশু দুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরদিন রোববার সকালে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ দুটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়।
কীভাবে ঘটল ঘটনাটি
হাতিরঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. সুমন মিয়া জানান, শুক্রবার (২০ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় আফরিদা ও ইলহাম তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে খাবার খেয়ে রাতে ঘুমিয়ে পড়ে। পরদিন শনিবার সকালে আফরিদা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে সন্ধ্যা ৭টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আফরিদার মরদেহ বাসায় আনার পরপরই ছোট ভাই ইলহাম বমি শুরু করে এবং তার অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাকে মগবাজার কমিউনিটি হাসপাতালে নেওয়া হলে শনিবার দুপুরেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
এসআই সুমন মিয়া আরও জানান, সুরতহাল প্রতিবেদনে শিশু দুটির শরীরে কোনো ধরনের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। একই খাবার খেয়ে তাদের বাবা-মাও অসুস্থ হয়ে পড়েন।
পুলিশের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, এটি ফুড পয়জনিংয়ের ঘটনা হতে পারে। তবে খাবারটি বাসায় রান্না করা হয়েছিল, নাকি বাইরে কোনো রেস্টুরেন্ট থেকে কেনা হয়েছিল—সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহত শিশুদের বাবা মোসলে উদ্দিন চৌধুরী একটি গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) হিসেবে কর্মরত। মা সাইদা জাকাওয়াত আরা গৃহিণী। তাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার দামতি গ্রামে।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আফরিদার দাদা অ্যাডভোকেট রমিজ উদ্দিনের বাসা কুমিল্লা মহানগরীর কোতোয়ালি থানার ফারুকী হাউজ এলাকায়। সে কারণে আফরিদা ও ইলহামের জানাজার নামাজ কুমিল্লা নগরীর আবতাব উদ্দিন মসজিদের সামনে অনুষ্ঠিত হয়। পরে তাদের গ্রামের বাড়ি দামতির পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
শিশুদের চাচা তৌহিদ আলম চৌধুরী বলেন, “আফরিদা বেইলি রোডের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। ১৬ ডিসেম্বর ওর জন্মদিন ছিল। সেদিন বাবা-মা দুই সন্তানকে নিয়ে বাইরে একটি রেস্টুরেন্টে খাবার খেয়েছিল। চার দিন পর তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে। ওই খাবার থেকেই নাকি অন্য কোনো খাবার থেকে বিষক্রিয়া হয়েছে—তা আমরা নিজেরাও বুঝতে পারছি না। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।”
আরেক চাচা এহছান উদ্দিন জানান, “বাচ্চারা অসুস্থ হলে বাসায় প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে অবস্থা গুরুতর হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায়ই তাদের মৃত্যু হয়।”
এ ঘটনায় এলাকায় গুঞ্জন উঠেছে—এটি সাধারণ ফুড পয়জনিং নয়, বরং কোনো ধরনের ‘শ্লু পয়জনিং’ বা ইচ্ছাকৃত বিষপ্রয়োগের ঘটনা হতে পারে,একই সাথে বাবা,মা, ভাই, বোন আক্রান্ত সবাই একসাথে মারা যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল,এটা কোন ষড়যন্ত্র নয় ত এমনটি গুঞ্জন আছে এলাকায়। তবে পুলিশ বলছে, তদন্ত ছাড়া এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মুর্তুজা বলেন, “শনিবার সকালে এক শিশু এবং দুপুরে আরেক শিশু মারা যায়। তারা সবাই অসুস্থ ছিল। বাবা-মাও একই খাবার খেয়ে অসুস্থ হন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, খাবারে বিষক্রিয়ার কারণেই এই মৃত্যু। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও তদন্তের পরই প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
তদন্তের অপেক্ষা
পুলিশ জানিয়েছে, খাবারের উৎস, বাসার পরিবেশ, পারিবারিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট—সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত চলছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং কোনো অপরাধমূলক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট হবে।
দুই শিশুর আকস্মিক মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রশ্ন—এটি কি অবহেলা, না কি কোনো গোপন ষড়যন্ত্র? তদন্তের ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে আছে

