সমতট ডেস্ক: ‘আমি চা বানাচ্ছিলাম, হঠাৎ আমার দোকানের ক্যাশ বাক্সসহ পুরো দোকান কেঁপে উঠলো। আমরা কয়েকজন ভয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসতেই দেখি একটা বাসার রেলিং ভেঙে কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তখন কাছে গিয়ে দেখলাম তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন। আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। চারদিকে লোকজনের চিৎকার। মুহূর্তের মধ্যে এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা কিছুক্ষণের জন্য নিজের কাছে দুঃস্বপ্ন মনে হলেও তা কিছুতেই ভুলতে পারছি না। এখনও সেই আতঙ্ক কাটেনি। ভয়ের মধ্যে আছি আবার কখন ভূমিকম্প হয়।’
গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে রাজধানীর পুরোনো ঢাকার বংশালের আরমানিটোলা এলাকায় একটি ভবনের ছাদের রেলিং ভেঙে তিনজন নিহত হওয়ার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নিজের আতঙ্কের কথা বাংলা ট্রিবিউনকে এভাবেই বলছিলেন চা দোকানদার আবুল কাশেম।
তিনি আরও বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে ঢাকা শহরে গত ১৬ বছর ধরে ব্যবসা করছি। ৮ বছরের একটা মেয়ে আর ১২ বছরের একটা ছেলে আছে। তারা স্কুলে পড়াশোনা করে। চোখের সামনে এরকম দুর্ঘটনা দেখার পর থেকে আর চা বানাতে ভালো লাগছে না। চিন্তায় আছি ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। যারাই দোকানে আসছে নানান ধরনের কথাবার্তা বলছে, যে রাজধানীর বেশিরভাগ ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। আমি মরে গেলেও তো সমস্যা নাই কিন্তু আমার ছেলে-মেয়ের যদি কিছু হয় তাহলে তো আমরাও মরে যাব।’
চা দোকানদার আবুল কাশেমের মতো ভূমিকম্প আতঙ্ক এখন টং দোকান থেকে অট্টালিকায় বিরাজ করছে। অগ্নিকাণ্ড, সড়ক দুর্ঘটনা, নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ এই শহরের প্রতিদিনের চিত্র হলেও এবার তার সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে মাত্র ৩২ ঘণ্টার ব্যবধানে ৪ বার ভূমিকম্প। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ এবং নগরবিদরা বলছেন, এই ভূমিকম্প ছিল কেবল সতর্কতার পূর্ববার্তা। এখনই পরিপূর্ণ সতর্কতা না মানলে মৃত্যুকূপে পরিণত হবে ঢাকা।
ভূমিকম্পে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ভবনে ফাটল, আতঙ্কে বাসিন্দারা
গত শুক্রবার (২১ নভেম্বর) রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অনুভূত হওয়া ভূমিকম্পে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বেশকিছু ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মালিবাগ চৌধুরী পাড়ায় একটি, আরমানিটোলায় একটি, স্বামীবাগে একটি, বনানীতে একটি, কলাবাগানে একটি, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি, নদ্দায় একটি, দক্ষিণ বনশ্রী এলাকায় একটি, মোহাম্মদপুরে একটি, খিলগাঁও এলাকায় একটি, বাড্ডায় একটি, সিপাহীবাগে একটি, মগবাজারের মধুবাগে একটি এবং হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এলাকায় একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এছাড়াও রামপুরা টিভি রোডে কয়েকটি, কলাবাগানের আবেদখালী রোড একটি ভবন হেলে পড়েছে। উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর রোডের ছয় তলার একটি ভবনের দ্বিতীয় তলায় চার সাইডে বড় ফাটল ধরেছে। পঙ্গু হাসপাতালের সামনের অংশে ওপর পর্যন্ত বড় ফাটল ধরেছে। পুরান ঢাকার বেশ কয়েকটি ভবনসহ কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও ঢাকা কলেজের আবাসিক হলের বিভিন্ন জায়গাতেও ফাটল ধরেছে।
ভূমিকম্পে বাড্ডার যেই ভবনটিতে ফাটল ধরেছে সেখানকার বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই দিন আগেও নিশ্চিন্তে বউ বাচ্চা নিয়ে ঘুমাতে পারতাম। কিন্তু গত কালকের ভূমিকম্পের পর সব নাড়া দিয়ে দিয়েছে। আল্লাহর অশেষ মেহেরবানীতে বড় কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। তবে আমাদের ভবনের ফাটল দেওয়ার পর এখানকার সবাই আতঙ্কে আছি কখন কোন দুর্ঘটনা ঘটে। আমরা অলরেডি বাসা ছাড়ার কথা বলে দিয়েছি।’
পুরোনো ঢাকার বংশালের বাসিন্দা তাজুল খন্দকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বাসার থেকে একটু দূরেই গতকাল দুর্ঘটনা ঘটে তিনজন মারা গেছে। আমার ভবনটাতেও ফাটল দেখা দিয়েছে। ভবন থেকে টাইলস খসে পড়েছে। কী করবো ভেবে উঠতে পারছি না। পুরো শহরের একই অবস্থা। ভাবছি পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যাব। কিন্তু ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা নিজের চাকরি সবকিছু মিলিয়ে নিরাপত্তা সংখ্যা সত্ত্বেও ঢাকায় থাকতে বাধ্য হচ্ছি।’
ধানমন্ডির বাসিন্দা জয়নাল আবেদীন মিন্টু বলেন, ‘দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভেঙে ফেলার ব্যবস্থা করা হোক। এছাড়াও কম ঝুঁকিপূর্ণ ভবন যেগুলো সংস্কার হলে ঝুঁকি এড়াবে সেগুলোর তালিকা করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সেগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার জন্য রাজউক ও সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অন্যথায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্মুখীন হবে রাজধানীর বাসিন্দারা।’
কবি নজরুল কলেজের একমাত্র ছাত্রাবাস শহীদ শামসুল আলম হলের শিক্ষার্থী বিপ্লব শেখ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভূমিকম্পে হলের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল ধরেছে। এখানে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর বসবাস। সবাই এখন আতঙ্কে আছে। কলেজ প্রশাসনকে জানানো হয়েছে, কিন্তু তারা কিছু বলেনি। ঐতিহ্যের কথা বলে এই হলে কোনও ধরনের সংস্কার কাজ হয়নি। অথচ এখন সবাইকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে থাকতে হচ্ছে।’
দুশ্চিন্তার মূল কারণ নকশাবহির্ভূত ভবন
রাজধানীতে গড়ে ওঠা ভবনগুলোর প্রায় ৭৪ শতাংশই নকশাবহির্ভূত। অর্থাৎ নির্মাণের সময় নকশা অনুমোদন নেওয়া হয়নি, অথবা অনুমোদিত নকশা থেকে ব্যাপক বিচ্যুতি ঘটেছে। এই অনিয়ম শুধু আবাসিক ভবনেই নয়, বাণিজ্যিক ভবন, মার্কেট, স্কুল-কলেজ—সবখানেই দেখা যায়। ভূমিকম্পের যে কয়েকটি ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে তাদের অধিকাংশই নকশা বহির্ভূত। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজধানীর বাকি নকশা বহির্ভূত ভবনগুলো।
সম্প্রতি সেফটি অ্যাওয়্যারনেস ফাউন্ডেশনের এক সেমিনারে জানানো হয়, ঢাকায় ২১ লাখ ৪৬ হাজার ভবন ঝুঁকিপূর্ণ। ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে এই ভবনগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর মূল কারণ, এই ভবনগুলো নির্মাণের সময় গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা মানা হয়নি, পরিপূর্ণ সেফটি অডিট নেই, দুর্যোগ সহনশীলতার প্রস্তুতি নেই। এমন অবস্থায় বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে এসব ভবন মৃত্যুপুঞ্জে পরিণত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজধানীর নকশা বহির্ভূত ভবন ও নগরায়ণের বিষয়ে স্থপতি ও নগরবিদ মো. ইকবাল হাবিব বলেন, ‘ঢাকার প্রায় ১৩ শতাংশ এলাকায় কোনও ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করা নিষিদ্ধ। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণে সেসব স্থানেও ভবন গড়ে উঠছে। পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙা তো দূরের কথা, তার ওপর নতুন নতুন ভবন নির্মাণ হচ্ছে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে এসব বিষয়ে সরকারকে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিলেও তারা তা গ্রহণ করেননি। ফলে এ শহরে এখন বসবাসই বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বাংলাদেশে গত শুক্রবার সকালে যে প্রচণ্ড ঝাঁকুনি অনুভূত হয়েছে, দেশের পটভূমিতে সাম্প্রতিক সময়ে তা সর্বোচ্চ। রাজধানী যে কতটা ঝুঁকিতে রয়েছে তা হয়ত অনেকে কল্পনায় করতে পারছে না। এখন থেকে উচ্চমহল সাবধান না হলে বা ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে।’

