বেলাল হোসেন রাজু: আকাশে তখনো ভোরের আলো ফোটেনি, পূর্ব দিগন্তে লালিমা ছোঁয়া মাত্র। ২৯ সেপ্টেম্বর, বিশ্বজুড়ে যখন ‘বিশ্ব হার্ট দিবস’ পালিত হচ্ছে, তখনই হৃদয়ের সুরক্ষায় এক মহৎ উদ্যোগের সূচনা হলো কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী ধর্মসাগর পাড়ে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ঠিক ৫টা ৪৫ মিনিট। প্রাতঃভ্রমণে আসা মানুষজন কিছুটা বিস্মিত, কিছুটা কৌতূহলী—কারণ সেখানে আয়োজিত হয়েছে এক ব্যতিক্রমী স্বাস্থ্যসেবার আয়োজন।
নিঃশব্দে শুরু হলো দিনের প্রথম কর্মসূচি। খোলা আকাশের নিচে, স্নিগ্ধ ভোরের হাওয়ায়, প্রাতঃভ্রমণে আসা মানুষের জন্য কুমিল্লা মর্ডাণ হাসপাতাল আয়োজন করলো ফ্রি ব্লাড সুগার পরীক্ষা এবং ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প। একদল নিবেদিতপ্রাণ স্বাস্থ্যকর্মী তখন মানুষের জীবনের অন্যতম প্রধান ঝুঁকি—ডায়াবেটিস—পরীক্ষায় ব্যস্ত। দিনটি যে কেবল হৃদয়ের যত্ন নেওয়ার, সেই বার্তা যেন ছড়িয়ে পড়লো ভোরের আলোয়।

সময় গড়িয়ে সকাল ৭টা ৩০ মিনিট। এবার চেতনা জাগানোর পালা। শুরু হলো হৃদরোগ নিয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা সভা। মানুষের ভিড়ে মুখরিত সেই প্রাঙ্গণ। আলোচনার প্রধান অতিথি ছিলেন প্রফেসর ডা. মাহাবুবুল ইসলাম মজুমদার, যাঁর বক্তব্যে উঠে এলো হৃদরোগ প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি। প্রধান বক্তা হিসেবে সহযোগী অধ্যাপক ডা. বেলাল হোসেন তাঁর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দিয়ে উপস্থিত শ্রোতাদের সচেতন করলেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে আলোচনায় অংশ নিলেন ডা. সাজেদুর রহমান, সিদ্দিকুর রহমান সুরুজ, আব্দুল ওয়াদুদ মজুমদার, অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান, এবং ডা. রাশেদুল ইসলাম বাপ্পী। প্রতিটি বক্তার কথায় ফুটে উঠলো, আধুনিক জীবনযাত্রায় হৃদয়ের যত্ন নেওয়া কতটা জরুরি।

আলোচনা শেষে, সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে শুরু হলো এক বর্ণাঢ্য র্যা লি। পথে পথে ছড়িয়ে পড়লো সচেতনতার স্লোগান। কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নুর মোহাম্মদ বশীর আহমেদ এই র্যা লির শুভ উদ্বোধন করেন। সচেতনতামূলক প্ল্যাকার্ড হাতে অংশগ্রহণকারীরা যখন শহরের রাজপথে হাঁটলেন, তখন তা যেন হৃদয়ের সুস্বাস্থ্যের প্রতিজ্ঞা নিয়ে এক সম্মিলিত পদযাত্রা।
দিনের কর্মসূচির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি শুরু হয় দুপুরে। দুপুর ২টায় যখন সূর্য মধ্যগগনে, তখন মডার্ণ হসপিটালে আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে ভিড় করেন হৃদরোগীরা। প্রায় ১৫০ জন হৃদরোগী এ দিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন। এই মহতী উদ্যোগে চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন এক ঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ কার্ডিওলজিস্ট: ক্লিনিক্যাল ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডা. এস. চক্রবর্ত্তী, সহযোগী অধ্যাপক ও সাবেক বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. বেলাল হোসেন, ক্লিনিক্যাল ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট ডা. কাজী ফাহিম মাহমুদ, এবং কার্ডিওলজিস্ট ডা. মো. রাশেদুল ইসলাম বাপ্পী।

র্যা লি শেষে বক্তব্য রাখেন মডার্ণ হসপিটালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মো. আবুল বাসার। তিনি অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “কার্ডিয়াক সমস্যায় আমরা সবসময় জনগণকে সেবা দিতে প্রস্তুত আছি।” তাঁর এই কথা যেন মডার্ণ হসপিটালের অঙ্গীকারকে পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করে। দিনব্যাপী এই সফল কর্মসূচির সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মজিবুর রহমান।
কুমিল্লা মডার্ণ হসপিটালের এই দিনব্যাপী কর্মসূচী প্রমাণ করলো, হৃদয়ের যত্নে একটি প্রতিষ্ঠান কতটা সংবেদনশীল হতে পারে। স্রেফ একটি দিবস পালন নয়, এটি ছিল হৃদয়ের সুরক্ষার জন্য সম্মিলিত এক প্রয়াস—ভোরের আলো থেকে দুপুরের প্রখরতা পর্যন্ত সচেতনতা ও সেবার এক অবিস্মরণীয় দিন।

