তৌহিদ হোসেন সরকার
কুমিল্লা
গোমতী নদীর তীর জুড়ে অবৈধ বসতি ও মাদকের নিরাপদ আস্তানা কুমিল্লাবাসীর জন্য দীর্ঘদিনের দুঃস্বপ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর এই অবৈধ বসতিগুলো শুধু নদীর সৌন্দর্য নষ্টই করেনি, বরং এখানে গড়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর মাদক সিন্ডিকেট। রাতের আঁধারে ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ নানা মাদকদ্রব্যের লেনদেন চলে প্রকাশ্যে, অথচ প্রশাসনের কিছু অংশের ‘নীরব সমর্থন’ থাকায় ব্যবসায়ীরা প্রায় ঝুঁকিমুক্তভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।বেড়িবাঁধ — মাদকের নিরাপদ রুট

গোমতীর বেড়িবাঁধের দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা বস্তিগুলো মাদক কারবারিদের জন্য আদর্শ জায়গা। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নদীর তীরঘেঁষা বস্তিগুলোতে দিনের বেলা সব কিছু স্বাভাবিক মনে হলেও রাত নামলেই রূপ বদলায় পুরো এলাকা। বেড়িবাঁধের ভেতরের সরু গলিগুলো মাদক সরবরাহের ‘ট্রানজিট পয়েন্ট’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাছাকাছি বন্দর সড়কের দ্রুতগামী পরিবহন ব্যবস্থার কারণে খুব সহজে কুমিল্লা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে মাদক সরবরাহ করা সম্ভব হয়।
একজন সাবেক মাদকাসক্ত যুবক জানান,
“বেড়িবাঁধের ভেতরে গেলে কখনো পুলিশ হয়তো চোখ বুজে চলে যায়, আবার কখনো অভিযান হয় দেখানোর জন্য। আসল ব্যবসায়ীরা কিন্তু ধরা পড়ে না।”
অতীতে একাধিকবার প্রশাসন অবৈধ বসতি উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী নেতা ও পাতিনেতার হস্তক্ষেপে তা ভেস্তে গেছে। ‘আবাসিক এলাকা রক্ষা’র নামে আন্দোলন গড়ে তুলে তারা মূলত মাদক সিন্ডিকেট ও অবৈধ দখলদারদের স্বার্থ রক্ষা করেছেন — এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
একজন প্রবীণ নাগরিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“যতবার উচ্ছেদ হয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই আবার ঘর উঠে গেছে। যারা এই ঘর তুলছে, তারা একা নয় — পেছনে বড় ক্ষমতার হাত আছে।”
আদালতের কড়া নির্দেশ
সম্প্রতি মহামান্য হাইকোর্ট এক রায়ে গোমতী নদীর সব অবৈধ স্থাপনা ছয় মাসের মধ্যে উচ্ছেদ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এই নির্দেশনায় কুমিল্লাবাসী আশার আলো দেখলেও, শঙ্কা রয়ে গেছে—আবারও কি প্রভাবশালীদের চাপে প্রশাসন পিছিয়ে যাবে?
কুমিল্লা শহরের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন,
“যদি সত্যিই সব উচ্ছেদ হয়, তাহলে কুমিল্লার বদনাম কিছুটা কমবে। আমাদের সন্তানদের মাদক থেকে বাঁচানো যাবে।”
প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের কিছু সদস্য মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে গোপন সমঝোতায় থাকেন। ফলে মাদকের আখড়া ও অবৈধ বসতি বছরের পর বছর টিকে আছে। একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, মাদক ব্যবসা বন্ধে কাগজে কলমে অভিযান হলেও বাস্তবে আসল নেটওয়ার্ক অক্ষত থাকে।
জনগণের প্রত্যাশা
সচেতন নাগরিকদের দাবি, হাইকোর্টের এই নির্দেশ যেন শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ না থাকে। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা, পুলিশের ভেতরের দুর্নীতিবাজ অংশকে চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া এবং নদীর তীরে দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কতটা দ্রুত ও কঠোরভাবে এই নির্দেশ বাস্তবায়ন করে গোমতী নদীর তীরকে অবৈধ দখল ও মাদকমুক্ত করতে সক্ষম হয়। যদি এবারও ব্যর্থ হয়, তবে গোমতী শুধু নদী নয় — কুমিল্লার অপরাধ ইতিহাসের অংশ হিসেবেই থেকে যাবে।

