সমতট ডেস্ক: লক্ষ্মীপুর: বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত লক্ষ্মীপুর জেলায় আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরুকরণ দেখা যাচ্ছে। এতদিন ধরে আসনগুলোতে বিএনপির একক আধিপত্য থাকলেও, এবার জামায়াতে ইসলামী চারটি আসনেই তাদের প্রার্থী ঘোষণা করে ভোটের মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে দল গোছাতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
জুলাই বিপ্লবের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় লক্ষ্মীপুরের চারটি আসনে নতুন করে হিসাব কষতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। নিজেদের অবস্থান জানান দিতে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা।
লক্ষ্মীপুর-১ (রামগঞ্জ): একাধিক প্রার্থীর কোন্দলে জামায়াতের প্রার্থী এগিয়ে
রামগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বিএনপির একাধিক নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ায় তাদের মধ্যে কোন্দল স্পষ্ট। এই সুযোগে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী রামগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির নাজমুল হাসান পাটোয়ারী তার অবস্থান সুসংহত করছেন। তিনি নিয়মিত গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তার সমর্থকরা তাকে বিজয়ী করতে কাজ করে যাচ্ছেন।
বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক হারুনুর রশিদ, রামগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ভিপি আবদুর রহিম, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ইয়াছিন আলী, স্মার্ট টেকনোলজিস বিডি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী জিয়াউল হক জিয়ার ছেলে মাশফিকুল হক জয়।
এই আসন থেকে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিমও ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর ও সদরের একাংশ): আবুল খায়ের ভূঁইয়ার একক আধিপত্য
লক্ষ্মীপুর-২ আসনে বিএনপির প্রবীণ নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া তার একক আধিপত্য ধরে রেখেছেন। তিনি তিনবার এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তবে, তার পাশাপাশি দলটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ হারুনও এবার মনোনয়নপ্রত্যাশী বলে জানা গেছে।
এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জেলা জামায়াতের আমির এসইউএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া। তিনি অসুস্থ থাকায় তার পক্ষে দলীয় নেতাকর্মীরা প্রচার চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইনও এই আসনে তার প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন।
লক্ষ্মীপুর-৩ (সদর): শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির শক্ত অবস্থান
লক্ষ্মীপুর সদর আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি একক প্রার্থী হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছেন। তিনি এর আগেও দু’বার এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ড. রেজাউল করিম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় গণসংযোগ করছেন এবং জুলাই বিপ্লবের ধারাবাহিকতায় একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির দাবি জানিয়েছেন।
এ আসনে গণঅধিকার পরিষদের নুর মোহাম্মদ, ইসলামী আন্দোলনের ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম এবং খেলাফত মজলিসের মাওলানা মোহাম্মদ ফয়সালের নামও শোনা যাচ্ছে।
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর): জোটের সমীকরণ ও তৃণমূলের চাওয়া
লক্ষ্মীপুর-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনটি বিএনপিকে বেশ ভাবাচ্ছে। জোটগত কারণে কেন্দ্রীয় বিএনপি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আবদুর রবকে সমর্থন দিলেও, তৃণমূলের বিএনপি নেতাকর্মীরা চান এবিএম আশরাফ উদ্দিন নিজানকে। তিনি এর আগে দুবার ধানের শীষ প্রতীকে এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।
অন্যদিকে, জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জেলা জামায়াতের সাবেক নায়েবে আমির এআর হাফিজ উল্যাহ। এই উপকূলীয় আসনে ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী আল্লামা খালেদ সাইফুল্লাহরও জনপ্রিয়তা রয়েছে।
লক্ষ্মীপুর জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হাসিবুর রহমান আশাবাদী, নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তারা চারটি আসনেই জয়লাভ করবেন। তবে শিক্ষাবিদ ও সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক)-এর সদস্য অধ্যাপক জেডএম ফারুকী মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলো যদি আবার পুরনো অবস্থানে ফিরে যায়, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার।
এই মুহূর্তে লক্ষ্মীপুরের চারটি আসনেই জামায়াতের সরব উপস্থিতি বিএনপির জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই জেলায় ধানের শীষের প্রার্থীরা তাদের আধিপত্য ধরে রাখতে পারেন কিনা।

