সমতট ডেস্ক : দেশ থেকে চাঁদাবাজি দূর করতে হলে পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন দরকার বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। তার দাবি, ‘পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে জামায়াতে ইসলামী বিজয় লাভ করবে।’
শুক্রবার (১৫ আগস্ট) বিকেলে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার রাজাবাড়ী হাটে নির্বাচনী গণসংযোগকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন।
জামায়াতের এই নেতা রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির মনোনীত প্রার্থী।
তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘দেশে জাসটিস পেতে হলে আল্লাহর আইন সুবিচার করার যে আইন সেটা দরকার। সেজন্য আরেকটি যুদ্ধ হতে হবে। আমাদের কথা এভাবে- ‘আবু সাঈদ মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ।’ এখন বাস্তবে আরেকটা যুদ্ধ প্রয়োজন আছে।’
মুজিবুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে মানুষের কল্যাণের জন্য যে সরকার হওয়া দরকার ছিল, সেটা হয়নি। বিশেষ করে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, পুঁজিবাদ, সমাজবাদ, জাতীয়তাবাদ, মানবরচিত যত মতবাদ আছে, এই মতবাদগুলো কখনো মানুষের কল্যাণ দিতে পারেনি, এটা একেবারে পরীক্ষিত সত্য। মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ (সা.) আসার পর ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হলো, তিঁনি ইসলামি সমাজ বিনির্মাণ করলেন, মানুষের আইনের পরিবর্তে আল্লাহর আইন যখন চালু হলো, তখন মানুষের দুঃখ কষ্ট দূর হলো।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত কোনো সরকার সত্যিকার মানুষের কোনো কল্যাণ করতে পারেনি। পাকিস্তান আমলে ২৪ বছর এরা ইসলামের নামে দেশ করলেও সত্যিকার অর্থে মানুষের কোনো কল্যাণ করতে পারেনি, আর ইসলামেরও কিছু করতে পারেনি। যার ফলে যা হওয়ার তাই হয়েছে। বাংলাদেশ ৭১ সাল থেকে ২০২৪, প্রায় ৫৪ বছর। ওদিকে ২৪, এদিকে ৫৪, প্রায় ৭৮ বছরে জনগণ আসলে সত্যিকার অর্থে কোনো সুখ দেখতে পায়নি। কেউ বলেছে গণতন্ত্র দেব, কেউ বলেছে আমি সস্তা চাল খাওয়াব, কেউ বলেছে আমার ভোট আমি দেব, যাকে ইচ্ছা তাকে দেব। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল, কোনোটাই করতে পারে নাই। আমার ভোট আমি দেব’র জায়গায় সেখানে বলা হলো, আমার ভোট আমি দেব, তোমারটাও আমি দেব, মানে অন্যের ভোট স্বীকৃতি দেয়নি। যার ফলে পরবর্তীতে কেয়ারটেকার গঠন করা হলো, কেয়ারটেকারকেও তারা বাতিল করে দিল সংবিধান থেকে। যার ফলে মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো।’
জামায়াতের নায়েবে আমির বলেন, ‘২০১৪ সালে নির্বাচন হলো, বিনা ভোটে ১৫৪ জন পাস করে গেল। অথচ এটা জনগণের ভোটে হলে নির্বাচিত সরকার বলা যেত, এটা নির্বাচন হয় নাই। ২০১৮-তে দিনের ভোট রাতে করা হলো, যাতে ডাকাতি কেউ দেখতে না পায়। আন্তর্জাতিকভাবে এটা তামাশার নির্বাচন বলে অভিহিত করা হলো। আর ২০২৪ সালে নির্বাচন, ফ্যাসিস্ট সরকারের যে নির্বাচন ব্যবস্থা, এত দুর্নাম কুড়াল যে মানুষ ভোটকেন্দ্রে গেল না। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কুকুর শুয়ে আছে, বিভিন্ন প্রাণী শুয়ে আছে, কিন্তু মানুষ পাওয়া গেল না। আমি আর ডামি নির্বাচন, এটা ইতিহাসে কখনো দেখা যায়নি।’
সাবেক এই এমপি বলেন, ‘আমার বক্তব্য হলো, দীর্ঘদিন পরে আমাদের ছাত্র-জনতার আন্দোলন বিজয় লাভ করেছে। উই ওয়ান্ট জাস্টিস, সুবিচার পাওয়ার লক্ষ্যে আন্দোলন করে প্রায় দুই হাজার ছাত্র-জনতা জীবন দিয়েছে এবং অনেক আহত হয়েছে। প্রচুর পরিমাণে এখনো তাদের তালিকা তৈরি হয়নি। আমরা ১২ খন্ডে তাদের তালিকা বের করছি আসতে আসতে, এটা বাংলা, ইংরেজি ও আরবিতে হয়েছে। আমরা এর মোড়ক উন্মেচন করেছি। এটা যদি কমপ্লিট হয় তাহলে দেখা যাবে, বহু মানুষ এখনো আছে, যাদের তালিকা এখনো হয়নি। সেজন্য তাদের রক্তের বিনিময়ে যে আমরা পেলাম একটা স্বাধীনতা, এটাকে বলা হচ্ছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা।’
তিনি বলেন, ‘যারা অতীতে গোলমাল করেছে, চাঁদাবাজি করেছে, বিভিন্ন ধরণের অন্যায় কাজ করছে, মানুষ হত্যা করেছে, ওদের সিলসিলা কিন্তু এখনো আছে। চাঁদা না দিলে জীবন শেষ হয়ে যাচ্ছে। চাঁদাবাজদের কোনো দল আছে, আমরা মনে করি না। এখন কেউ যদি নিজের কথা মনে করে যে, এটা আমার দলের লোক, সেটা তাদের ব্যাপার।’
মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমরা মনে করি, যত চাঁদাবাজি আছে, যত অন্যায় আছে, এগুলো দূর করতে হলে, পিআর সিস্টেমে নির্বাচন দরকার। এই পিআর সিস্টেম নির্বাচন হলে আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী যেভাবে সংগঠন এতদিন ধরে মজবুত করছে, এতদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছে, ইনশাআল্লাহ জামায়াতে ইসলামী বিজয় লাভ করবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের চেষ্টা আর সকলের কাছে আমাদের দোয়া, চূড়ান্ত ফায়সালা আল্লাহর কাছে, তিনি যাকে বিজয়ী করবেন, সে বিজয়ী হবেন। তিনি যাকে পরাজিত করবেন, সত্যিকার অর্থে সে পরাজিত হবে।’
জনগণের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, দীর্ঘদিন আল্লাহর আইন সমাজ থেকে অনুপস্থিত। আগামী দিনে জাতীয় সংসদে কোরআনকে আমরা পৌঁছাতে চাই। কোরআনের আইন চালু করতে চাই। জনগণ এটা বলে ফেলছে এখন, এটাকেও দেখলাম, ওটাকেও দেখলাম। এখন যাদেরকে দেখা হয়নি, এই ইসলাম। সেজন্য এখন সবাই বলছে, সকলের দেখা শেষ, আগামী দিনে ইসলামের বাংলাদেশ। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণ যেভাবে নামছে, সাধারণ জনগণ যেভাবে সাড়া দিচ্ছে, আল্লাহ যদি রহম করেন, ইনশাআল্লাহ জামায়াতে ইসলামী জয়লাভ করবে, দাঁড়িপাল্লা বিজয় লাভ করবে ইনশাআল্লাহ।’
এসময় জনসাধারণের কাছে দাঁড়িপাল্লায় ভোট চান অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। গণসংযোগে জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী জেলা আমির অধ্যাপক আব্দুল খালেক, সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক কামরুজ্জামান, গোদাগাড়ী উপজেলা আমির মো. হুমায়ুন আলী, জেলার প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সদস্য মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ অংশ নেন।
অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ পেয়ে অনেকে আপ্লুত হয়ে যান। করমর্দন ও কোলাকুলি করে আগামী নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমিরের কাছে শিশুরাও ছুটে আসে। তাদের মাথায় হাত বুলিয়েও দেন তিনি।
এসময় জামায়াতে ইসলামীর রাজশাহী জেলা আমির অধ্যাপক আব্দুল খালেক বলেন, ‘প্রায় এক বছর যাবত আমরা ধারাবাহিক কাজ করছি। আমি বিশ্বাস করি, যে গণজোয়ার লক্ষ্য করছি, এ গণজোয়ার সঠিকভাবে প্রবাহিত হলে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে, গোদাগাড়ী-তানোরে দাঁড়িপাল্লা বিজয় লাভ করবে ইনশাআল্লাহ। জনগণের যে প্রত্যাশা, জাসটিস কায়েম করার, এটা জামায়াতে ইসলামী আগামী দিনে বাংলাদেশ জাসটিস কায়েম করবে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হবে।’
গণসংযোগ শেষে রাজাবাড়ি হাট জামে মসজিদে মাগরিবের নামাজে ইমামতি করেন অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। নামাজ শেষে দেশবাসীর কল্যাণ এবং ফিলিস্তিনের মুসলিমদের স্বাধীনতা ও মুক্তি কামনায় বিশেষ দোয়া মোনাজাত করেন তিনি। এরপর মসজিদে এক সভায় জনসাধারণের উদ্দেশে বক্তব্য দেন।

