সমতট ডেক্স : সারাদেশে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ চালানো প্রসঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ডেভিল যতদিন শেষ না হবে ততদিন পর্যন্ত অপারেশন চলবে।
রোববার (৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে মৃত্তিকা সম্পদ ইনস্টিটিউটের নতুন মৃত্তিকা ভবন উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
যারা দেশকে অস্থিতিশীল করবে তাদের টার্গেট করে ডেভিল হান্ট অপারেশন চলবে বলে জানিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, গাজীপুরে যারা ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের অনেককেই আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাড়াতাড়ি বাকিদেরও আনা হবে।
গত শুক্রবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে গাজীপুরে পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে শিক্ষার্থীদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর নড়েচড়ে বসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ঘোষণা দেয় ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ অভিযানের। এরপর শনিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকেই সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে যৌথ বাহিনী। শনিবার রাত থেকেই গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি দেখা গেছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার চৌধুরী যাবের সাদেক জানান, ছাত্র-জনতার ওপর হামলার ঘটনায় এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের ৪০ জন নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন পাঁচ কর্মকর্তাকে গ্রেফতার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের অপরাধ দেশবাসীর জানা রয়েছে।
শুক্রবার রাতে গাজীপুরের ধীরাশ্রমের দক্ষিণখানে পতিত স্বৈরাচারের মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় সমন্বয়কসহ ২৫-৩০ জন ছাত্র-জনতাকে মোজাম্মেল হকের বাড়িতে ডেকে নেয়ার অভিযোগ ওঠে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে।
আহতদের দাবি, কৌশলে তাদের বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করিয়ে মসজিদের মাইকে ‘ডাকাতি হচ্ছে’ ঘোষণা দিয়ে হামলা চালানো হয়। মুখে মাস্ক পরে, ধারালো অস্ত্র হাতে বেশ কয়েকজনকে মারধর করে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। এতে আহত হন অন্তত ২০ জন। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে সেনাবাহিনী। আহতদের পাঠানো হয় গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাদের ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এ ঘটনার পর ক্ষোভে ফুঁসছে ছাত্র-জনতা। জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবিতে শনিবার সড়কে বিক্ষোভ করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। আওয়ামী লীগকে দ্রুত নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি হামলাকারীদের ধরতে আলটিমেটাম দিয়েছেন তারা।ঢাকার ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ির পাশে নবনির্মিত একটি ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড নিয়ে সবার মনে তৈরি হয়েছে নানা কৌতূহল। গত বুধবার রাতে ছাত্র-জনতা বাড়িটি ভাঙার সময় সেই স্থানটি কারও তেমন দৃষ্টির সীমানায় আসেনি। কয়েকজন যুবকের সেটি নজরে এলেও বিষয়টি তারা পাত্তা দেননি। কিন্তু, গত শুক্রবার রাত থেকে ওই আন্ডারগ্রাউন্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
গতকাল শনিবার সকালে সরেজমিনে দেখা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমানের পুরোনো বাড়ির পাশের নবনির্মিত ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ডটি পানিতে পরিপূর্ণ। পানিতে একজোড়া স্যান্ডেল, একটি লুঙ্গি ও একাধিক পানির বোতল ভাসতে দেখা গেছে। ওই পানিতে চুলও ভাসছিল। সেখানে আসা দর্শনার্থীদের কেউ কেউ পানিতে নেমে বিকল্প সিঁড়ি রয়েছে কি না তা খোঁজার চেষ্টা করছেন।
কাউকে অলো জ্বালিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে। ঢাকা ছাড়াও অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে এখানে এসেছেন আন্ডারগ্রাউন্ডটি দেখতে। কেউ কেউ ছবিও তুলছেন। কেউ নিজ ফেসবুকে করছেন লাইভ। কেউ আবার একে নতুন আয়নাঘর বলে অবহিত করেছেন। আবার কেউ বিষয়টির সত্যতা যাচাই করতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত তদন্তের আহ্বান জানাচ্ছেন।
পুলিশ জানায়, ওই স্থানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই ৯৯৯-এ কল দিয়েছেন। কোনো কোনো দর্শনার্থী জানিয়েছেন নিকটবর্তী থানার পুলিশকে। কিন্তু পুলিশ বিষয়টি পাত্তা দেয়নি। কেউ থানায় ফোন দিলে ডিউটি অফিসার বিষয়টি শোনার পর কল কেটে দিয়েছেন।
আরো দেখা যায়, ভাঙা বাড়িটি দেখতে অসংখ্য মানুষ এসেছেন। উৎসুক মানুষের চাপে ওই বাড়ির সামনের সড়কে যানজট দেখা দেয়। কেউ কেউ ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন আবার যারা ওই সড়ক দিয়ে যাচ্ছেন তারাও গাড়ি থামিয়ে ভাঙা বাড়িটি দেখছেন। এদিকে ভাঙা বাড়ির জিনিসপত্র যে যার মতো নিয়ে যাচ্ছেন। ভাঙা বাড়ির পাশের ভবনে ওই রহস্যময় আন্ডারগ্রাউন্ডের অবস্থান।
দেখা গেছে, ভবনটি নির্মাণাধীন। মাত্র একতলার ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটির আন্ডারগ্রাউন্ডে আরও দুই তলা রয়েছে। আন্ডারগ্রাউন্ডের নিচে নামার পর এটি মূলত গাড়ির পার্কিং এরিয়া বলে মনে হয়েছে। তবে এর নিচে আরও একতলা রয়েছে। ফ্লোরটি পানিতে পরিপূর্ণ।
স্থানীয়রা জানালেন, ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই ভবনে মাদকসেবীরা থাকতেন।
৩২ নম্বরে আসা আরমান নামে এক যুবক জানান, এ আন্ডারগ্রাউন্ড নিয়ে ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখতে পান তিনি। এরপর তিনি ও তার বন্ধু ওই আন্ডারগ্রাউন্ড দেখতে আসেন। তিনি নিচে নামার চেষ্টা করেন। কিন্তু, গভীর হওয়ার কারণে উঠে পড়েন। আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে প্রচণ্ড গন্ধ বের হচ্ছে। তাই বেশিদূর যাওয়া যায়নি। তার কাছে বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হয়েছে।
সোহেল নামে আরেক যুবক জানান, আন্ডারগ্রাউন্ডে আরো একতলা পার্কিং এরিয়া থাকতে পারে। পানি বেশি থাকার কারণে সেটি বোঝা যাচ্ছে না।
সাভার থেকে আসা রাবেয়া আক্তার জানান, আওয়ামী লীগের পতনের পর বিভিন্ন বন্দিশালার কথা শুনেছি। এটি গোপন বন্দিশালা কি না তা দেখতে এসেছি। তবে সেখানে পানি ছাড়া কিছুই দেখতে পেলাম না।
উল্লেখ্য, ওই আন্ডারগ্রাউন্ড দেখে সবার মধ্যে আয়নাঘরের কথা মনে হয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী মতের লোকজনকে বন্দি রাখার জন্য গোপন বন্দিশালা তৈরি করা হয়। সেখানে দিনের পর দিন তাদের অন্ধকার কুঠরিতে রাখা হতো। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর একাধিক আয়নাঘর থেকে ছাড়া পান ভুক্তভোগীরা। গুম কমিশন ওই আয়নাঘরের সত্যতা পেয়েছে।

