সমতট ডেস্ক :আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে বিমান বাহিনীর ড্রোন থেকে পাওয়া লাইভ ভিডিওর মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। নির্বাচনের সময় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নজরদারিতে বিমান বাহিনীর পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও র্যাবও ড্রোন ব্যবহার করতে পারবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসি সূত্র জানিয়েছে, নির্বাচনকালীন যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। সে কারণে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অবস্থা দ্রুত নির্ণয়, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি অত্যন্ত সহায়ক হবে বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী, বিমান বাহিনী, বিজিবি ও র্যাব-এই তিন বাহিনী নির্বাচনে ড্রোন মোতায়েন করতে পারবে। তবে বিমান বাহিনীর ড্রোনের লাইভ ফিড নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়েও সরবরাহ করতে হবে। অন্যদিকে বিজিবি ও র্যাব কেবল ইসির আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলে লাইভ ফিড দেবে।
সশস্ত্র বাহিনীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার, বিজিবি ও র্যাবের মহাপরিচালকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসির সিনিয়র সহকারী সচিব মো. শহীদুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। তফসিল পরবর্তী সময়ে নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন বাহিনী/সংস্থা/বিভাগ কর্তৃক সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুষ্ঠু ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।
চিঠিগুলোতে আরো বলা হয়েছে, ‘জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনকালীন যেকোনো ধরনের অনাকাঙিক্ষত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এরূপ পরিস্থিতিতে স্বল্প সময়ে মাঠপর্যায়ের বাস্তব অবস্থা নির্ণয়, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং যথাযথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ড্রোনের মাধ্যমে নজরদারি অত্যন্ত সহায়ক হবে।
এ অবস্থায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সম্পাদনের স্বার্থে বিমান বাহিনী, র্যাব ও বিজিবি কর্তৃক ড্রোন মোতায়েন করে ড্রোনের লাইভ ফিড নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের আইনশৃঙ্খলা সমন্বয় সেলে পাঠাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হলো। এছাড়া বিমান বাহিনীর ড্রোনের লাইভ ফিড ইসিসহ প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়েও দিতে বিমান বাহিনীর জন্য পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে।
এছাড়া ভোটে আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে সাইবার মনিটরিং সেল, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সেলসহ একাধিক মনিটরিং সেল গঠন করেছে নির্বাচন কমিশন, যারা সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেছেন, ড্রোন দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় করা যাবে না। তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনে করতে পারবে।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সন্ত্রাসীদের প্রতি মানবিক না হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ বলেছেন, ‘নির্বাচনে আমরা মানবিক হব, কিন্তু যারা ভাঙচুর, সহিংসতা, হত্যা করে, তাদের প্রতি মানবিক হওয়ার দরকার নেই। মেসেজ ইজ ভেরি ক্লিয়ার।’
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ভোটের মাঠপর্যায়ে প্রায় ১ লাখের বেশি সেনাসদস্য মোতায়েন থাকবে। এছাড়া নৌবাহিনীর ৫ হাজার, কোস্ট গার্ডের ৪ হাজার, বিজিবির ৩৭ হাজার, র্যাবের ৯ হাজার, পুলিশের প্রায় দেড় লাখ এবং আনসার বাহিনীর প্রায় ৫ লাখ সদস্য নিয়োজিত থাকবে।’
ইসির জারি করা ‘নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫’ এর ধারা ৯(চ) তে বলা হয়েছে, নির্বাচনি প্রচারণা এবং ভোটগ্রহণের সময় কোনো প্রকার ড্রোন, কোয়াডকপ্টার (Quadcopter) বা এইরূপ যন্ত্র ব্যবহার করিতে পারিবেন না।
এআইভিত্তিক অপতথ্যের বিষয়ে ইসি জানায়
এআইভিত্তিক অপতথ্য সবচেয়ে বেশি ছড়ানো হচ্ছে মেটার ফেসবুক থেকে। ৮৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। এছাড়া ১০ দশমিক ১২ শতাংশ কনটেন্ট ছড়ানো হয়েছে এক্স (আগে যার নাম ছিল টুইটার) থেকে।
জানা যায়, এআই অপতথ্য চিহ্নিত করতে ইসিকে সহায়তা করছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপির ই-মনিটর প্লাস প্ল্যাটফর্ম। এদের দেওয়া তথ্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে সরবরাহ করছে নির্বাচন কমিশন। বাহিনীগুলো স্ব স্ব সেল থেকে তা মোকাবেলার ব্যবস্থা নিচ্ছে। এছাড়া এনটিএমসিও ইসিকে এআইভিত্তিক অপতথ্য মোকাবেলায় সহায়তা দিচ্ছে।
ইউএনডিপি ই-মনিটর প্লাস প্ল্যাটফর্ম তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যে তথ্য দিয়েছে, এতে ৮৬ হাজার কনটেন্টের অধিকাংশই তৈরি হয়েছে ঢাকা, সিলেট, ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল অঞ্চল থেকে। অপতথ্যের ৯০ শতাংশ ছড়ানো হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে।
ইসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪২ হাজার ৭৭৯টি। এবার ভোটকক্ষের (বুথ) সংখ্যা ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২। গড়ে প্রতি ৩ হাজার ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইসি আরো জানায়, নির্বাচন কার্যক্রম পরিচালনায় দায়িত্ব পালন করবেন মোট ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন কর্মকর্তা। তাদের মধ্যে ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তা এবং ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন পোলিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৩৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।
১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট নিতে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন। সেদিন সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে তিনটা পর্যন্ত চলবে ভোটগ্রহণ।

